বাংলাদেশে জুয়া কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর। দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী, জুয়া একটি অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকারের নীতিগত অবস্থান হলো জনগণ, বিশেষ করে যুবসমাজকে জুয়ার সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার একাধিক মন্ত্রণালয় ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নিয়ে একটি বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা তৈরি এবং বিকল্প বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি (১৮৬০) এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধি (১৮৬০) এবং জুয়া নিয়ন্ত্রণ আইন জুয়াকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। বিশেষ করে, জনস্বাস্থ্য ও জনশৃঙ্খলা অধ্যাদেশ, ১৯৬৫-এর অধীনে জুয়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর মাধ্যমে জুয়ার মাধ্যমে অর্জিত আয় বৈধকরণের চেষ্টাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো, বিশেষ করে পুলিশ ও র্যাব, নিয়মিতভাবে অভিযান চালিয়ে দেশের বিভিন্ন部位ে পরিচালিত অবৈধ জুয়া ডেন ও ক্যাসিনো বন্ধ করে থাকে।

সরকারি তথ্য অনুসারে, শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ২৩০টির বেশি অভিযান চালানো হয়, যেখানে ১,৫০০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে জুয়া খেলায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়। নিচের সারণীটি সাম্প্রতিক বছরে জুয়া নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রধান অভিযানগুলোর একটি পরিসংখ্যান প্রদর্শন করছে:

বছর অভিযানের সংখ্যা আটকের সংখ্যা জব্দকৃত নগদ অর্থ (আনুমানিক)
২০২১ ১৮০ ১,১০০ ৩.৫ কোটি টাকা
২০২২ ২০৫ ১,৩৫০ ৫.২ কোটি টাকা
২০২৩ ২৩০ ১,৫০০+ ৭.৮ কোটি টাকা

অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা আরও জটিল। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী (আইএসপি) কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ জুয়া এবং অন্যান্য অবৈধ জুয়া ও বেটিং সাইট ব্লক করার দায়িত্ব পালন করে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বিটিআরসি ৫০০টিরও বেশি বিদেশি জুয়া ও বেটিং ওয়েবসাইট বাংলাদেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জন্য ব্লক করার নির্দেশনা জারি করে। তবে প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে, অনেক সাইট ভিপিএন (VPN) এর মাধ্যমে অ্যাক্সেস করা যায় বলে জানা গেছে, যা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সরকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা হলো জনসচেতনতা সৃষ্টি। তথ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে টেলিভিশন, রেডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার কুফল সম্পর্কে প্রচারণা চালায়। এগুলোর লক্ষ্য হলো মানুষকে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে, জুয়ার আসক্তি এবং তার ফলে সৃষ্ট আর্থিক দুরবস্থা, পারিবারিক কলহ ও মানসিক চাপ সম্পর্কে সতর্ক করা। সরকারি প্রচারণায় জুয়াকে একটি "সম্পদ নাশক" অভ্যাস হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

জুয়া নিয়ন্ত্রণে সরকারের অর্থনৈতিক নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার জুয়াকে কোনো বৈধ শিল্প বা রাজস্বের উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এটি ভারত বা ম্যাকাওয়ের মতো কিছু দেশের নীতির থেকে ভিন্ন, যেখানে নিয়ন্ত্রিত জুয়া শিল্প থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য কর রাজস্ব পায়। বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান হলো যে জুয়া থেকে সম্ভাব্য সামান্য রাজস্ব আয়ের চেয়ে এর সামাজিক ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে, সরকার কিছু নির্দিষ্ট ক্রীড়াক্ষেত্রে, যেমন জাতীয় লটারি-কে বৈধতা দিয়েছে, যা সরাসরি সরকারি তত্ত্বাবধানে ও নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং এর আয় সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা)ও জুয়া নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রয়েছে। তারা তাদের এখতিয়ারের范围内 অবৈধ জুয়ার আড্ডা বা ডেন চালু আছে কিনা তা নজরদারি করে এবং প্রয়োজনবোধে স্থানীয় প্রশাসনকে তথ্য সরবরাহ করে। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে, সরকার জুয়ার বিকল্প হিসেবে যুবসমাজের জন্য ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক 활동ের সুযোগ সৃষ্টির ওপরও জোর দেয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বিভিন্ন স্তরে খেলাধুলার আয়োজন করে তরুণদের শক্তিকে ইতিবাচক দিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করে।

চলমান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে জুয়া কার্যক্রম পরিচালনা, যা ট্র্যাক করা কঠিন। এছাড়াও, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মতো গভীর সামাজিক সমস্যাগুলো有时 মানুষকে দ্রুত অর্থোপার্জনের আশায় জুয়ার দিকে ঠেলে দেয়। সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এই অন্তর্নিহিত socioeconomic কারণগুলোরও সমাধান করা। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে জুয়া নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা মূলত নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিরোধমূলক, যা জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।